date
cover
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
নিয়মিত কলাম
বাংলাদেশ ও বিশ্ব অধ্যয়ন-২৮
॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর ॥
যেসব বিষয়ে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে

ভিয়েতনাম খুব উন্নত দেশ নয় বলেই সবার জানা, আমিও সেরূপ জানতাম, তবে তা অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিচারে। সেখানেও রয়েছে ঘুষ-দুর্নীতি, রয়েছে দরিদ্র মানুষ তথা দারিদ্র্য। তা সত্ত্বেও ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৭% থেকে ৯%, যেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৫% থেকে ৬%। উল্লেখ্য, কম্বোডিয়ার মত দেশেরও প্রবৃদ্ধির হার ১৩%।
২০০৮ সালে ভিয়েতনামের GDP ছিল ৯১ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশের GDP ছিল ৭৯ বিলিয়ন ডলার। অথচ ১৯৯০ সালেও ভিয়েতনামের GDP ছিল মাত্র ৬.৫ বিলিয়ন ডলার,  সে বছর বাংলাদেশের GDP ছিল ২৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ১৯৯০ সালে ওদের তুলনায় আমাদের GDP ছিল ৪ গুণ বেশি। মাত্র ১৮ বছরের ব্যবধানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ আরও কত দিক থেকে ভিয়েতনাম আমাদের কত যে ছাড়িয়ে গেছে.., তা ধারণাতীত।
একদিকে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক নিষ্পেশনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, অন্যদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধ ছাড়াও আমেরিকার মত পরাশক্তির সাথে যুদ্ধ-জয়ের অনন্য ইতিহাস রয়েছে ভিয়েতনামের। শত বছর ধরে যুদ্ধে বিধ্বস্ত এবং হায়েনাদের লুটতরাজের কারণে যে ভিয়েতনাম হয়েছে সর্বহারা, সে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আগামীর সমৃদ্ধির নানা তৎপরতা বাংলাদেশের পশ্চাৎপদতার প্রেক্ষাপটে আলোচনার দাবি রাখে। এই সেদিনও যে দেশ ছিল আমাদের তুলনায় দরিদ্র, সে দেশ কিভাবে নিম্নোক্ত নানা ক্ষেত্রে উন্নয়ন-অগ্রগতিতে আমাদের পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তা শুধু লক্ষণীয়ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয়ও বটে।
একটি কমিউনিস্ট দেশ মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রয়োগ এবং মুক্তবুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা কাজে লাগিয়ে কিভাবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নব্বই দশক পর্যন্ত তাদের চেয়ে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ এই ১৮ বছরে কিভাবে ও কি হারে পিছিয়ে পড়েছে  -সে বিশ্লেষণই আমার এ কলামের উপজীব্য। 

ভিয়েতনাম বনাম বাংলাদেশ
ট্রান্সপোর্ট, ট্রাফিক ও রোড ম্যানেজমেন্ট

ভিয়েতনামের রোড ম্যানেজমেন্ট উন্নত দেশের মত অতটা আধুনিক নয়, তবে বাংলাদেশের তুলনায় ঢের উন্নত। সেখানে হাইওয়েতে গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের সুযোগ নেই, ফ্লাইওভার এবং ওভার ব্রিজও রয়েছে ৩ স্তর পর্যন্ত। গাড়ির গতি নির্ধারিত, তারা হাইওয়েতেও ততটা দ্রুত গাড়ি চালায় না। গাড়ি চলে রাস্তার ডানে অর্থাৎ গাড়ির স্টিয়ারিং থাকে বাঁ পাশে। এভাবে অনেক কিছুতেই তারা আমাদের উল্টো। সেখানে ট্রাফিক সিগনালিং কঠোর ও স্বয়ংক্রিয় তথা কম্পিউটারাইজ্ড। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সিগনালের পাশাপাশি পথচারীদের রাস্তা পারাপারের জন্য রয়েছে সিগনালিং। পথচারী ও গাড়ির চালক সকলেই সে সিগনাল মেনে চলে। এমনকি আমার মত বাংলার ভবঘুরেরাও সেখানে গিয়ে নিয়ম মানতে বাধ্য। কারণ নিয়ম না মানলে তাৎক্ষণিক দু’টো পরিণতি অবধারিত, যার যেকোন একটির শিকার আপনাকে হতেই হবে। এক, রেড বা ইয়েলো সিগনালে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামলে অন্যরা করুণ দৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকাবে; তারা ভাববে আপনি হয় পাগল, নতুবা নিয়ম-কানুন বোঝেন না। দুই, আপনি সিগনাল না মানলেও অন্য সবাই যেহেতু মানে, তাই সেখানে সিগনাল না মেনে নিজকে যে অক্ষত রাখতে পারবেন না, এটা নিশ্চিত।  ফলে আপনি যদি বাংলাদেশী বদভ্যাসবশতঃ রেড সিগনালে রাস্তায় পা রাখেন, তাহলে গ্রীন সিগনালের গাড়ি আপনাকে এমন সমুচিত শিক্ষা দেবে, যে শিক্ষা আপনার এ জনমে আর কাজে লাগানোর সুযোগ হবে না। 
বাংলাদেশের ট্রাফিক সিগনাল-পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল, তদুপরি এ নিয়ম মানে না কেউই, সবাই অ-নে-ক স্বাধীন। এখানে নিয়ম না মানাটাই হয়ে গেছে নিয়ম। চালক বা পথচারী কেউই সিগনালের তোয়াক্কা করে না। সাধারণ চালকরাতো বটেই, এমনকি মন্ত্রী বা নেতাদের গাড়ির চালকরাও তা মানে না। ট্রাফিক পুলিশ নির্বিকার তাকিয়ে থাকে নিয়ম অমান্যকারীর দিকে; কিছু বলেও না, করেও না। ভিয়েতনামে  সবকিছুই অটোমেটেড বলে এরূপ অলস ও অকার্যকর ট্রাফিক পুলিশের বেতনভার সইতে হয় না সেখানকার জনগণকে। আসলে পৃথিবীর কোন উন্নত বা আধুনিক দেশের রাস্তায় এখন আর আমাদের দেশের মত এত ট্রাফিক পুলিশ দেখা যায় না। সেখানে রাস্তার মাস্তান ও সড়ক-সন্ত্রাসীকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে দেয় কম্পিউটার। 
ভিয়েতনামকে বলা হয় মোটর বাইকের দেশ। সেখানকার রাস্তায় সারি সারিতে চলে শত-সহস্র মোটর বাইক। ঢাকা থেকে উড়াল দিয়ে ভিয়েতনাম পৌঁছলে আপনার কাছে মনে হবে যেন মোটর বাইকের মহা-মিছিলের মুখোমুখি আপনি; রাস্তায় শুধু বাইক আর বাইক। শহুরে রাস্তার প্রায় ৯০% ট্রান্সপোর্টই হচ্ছে মোটর বাইক, সাইকেল ৩%, বাকী ৭% হচ্ছে কার, টেক্সি, মাইক্রোবাস, মিনিবাস, বাস ইত্যাদি। তবে এয়ারপোর্ট রোড বা হাইওয়েতে মোটর বাইকের পাশাপাশি কার ও বড় ট্রান্সপোর্ট ২০% এর অধিক দেখা যায়। ছেলে-মেয়ে, শিশু-বৃদ্ধ সবাই যেন মোটর বাইকে দ্রুত ধাবমান সামনের দিকে। বাহন বা গাড়ির জন্য কেউ অপেক্ষা করছে না। কেউ কোথাও থেমে নেই। ট্রাফিক সিগনালে থামতে হলে তাও বড়জোর ৪০ সেকেন্ড।
বাবার পেছনে বড় সন্তান এবং মায়ের পেছনে  ছোট দু’সন্তানকে বসিয়ে দু’টি বাইকে পরিবারের ৫-৬ জনের একত্রে ঘুরতে যাওয়ার দৃশ্য সেখানে সাধারণ। মানুষকে বহন ছাড়াও নানা কাজে ব্যবহৃত হয় তাদের বাইক। এমনকি বাসা-বাড়ি পরিবর্তন করতেও মোটর বাইকই তাদের যথেষ্ট। নানা কৌশলে তারা বাইকে করেই এক স্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যায় মুরগী, ছাগল, গরু, বোঝা, সরঞ্জাম -গোটা সংসার।
পাবলিক পরিবহন হিসেবেও ব্যবহৃত হয় মোটর বাইক। আমাদের দেশে যেরূপ ঘর থেকে বের হলেই রিক্সা পাওয়া যায়, সেরূপ ভিয়েতনামেও ভাড়ায় পাওয়া যায় মোটর বাইক। ভাড়া হয় দু’রকমে। ঘন্টা বা দিনের জন্য আপনি বাইক ভাড়া নিতে পারেন, আবার বাইকের মালিক বা চালক ভাড়ার বিনিময়ে কাঙ্খিত স্থানে পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখানকার বাইকও আবার হরেক রকমের। বড় হোন্ডা বা জেন্ট্স বাইক, লেডিস বাইক, জুনিয়রস বাইক ইত্যাদি। ভিয়েতনামে মোটর বাইকের এই বহুল ব্যবহার এবং বাইকে দৈনন্দিন সকল প্রয়োজন মেটানোর কৌশল থেকে আমাদের শেখার রয়েছে অনেক কিছু।
আমাদের সমাজে প্রচলিত প্রবাদ ‘হোন্ডা চালায় গুন্ডারা’ -এ কথা ভিয়েতনামীদের ক্ষেত্রে যে মোটেও প্রযোজ্য নয়, তা সেখানকার রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার বাইকের সুশৃঙ্খল এগিয়ে চলাতেই প্রমাণিত। বাইক চালকরা যেন নিজেদের মধ্যে এমন বোঝাপড়া করে নিয়েছে- কেউ কাউকে ল্যাং মারবে না, লেইন বা লাইন ক্রস করবে না, অন্যকে পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতা  করবে না। সবাই যেন সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য সদা প্রস্তুত। বাইক চালকদের শৃঙ্খলা-ধৈর্য-সহমর্মিতা-ট্রাফিক আইন মানার সদিচ্ছা মহাস্বাধীন বাঙালির জন্য শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়।
ভিয়েতনামের ন্যায় হল্যান্ডেও দেখেছি সবাই প্যাডেল বাইক চালায়; ছেলে-বালিকা-বুড়ো, প্রফেসর, ভাইস-চ্যান্সেলর, আমলা-ব্যবসায়ী সব্বাই। বাইক চালানোর জন্য সেখানে অবশ্য প্রত্যেক রাস্তা ও ফুটপাতের পার্শ্বে আলাদা লেইন রয়েছে। বাইক সাধারণ বাহন হলেও ধনী দেশ হিসেবে তাদের সুউন্নত, অত্যাধুনিক ও দ্রুত গতিসম্পন্ন ট্রেন, বাস, ট্রামসহ নানা পাবলিক ও প্রাইভেট ট্রান্সপোর্টও রয়েছে কিন্তু।
হল্যান্ডের মত ধনী দেশে যেখানে প্যাডেল বাইকের সাধারণ জীবন; ভিয়েতনাম যেখানে মোটর বাইকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত, সেখানে আমাদের মত স্বল্পোন্নত একটি দেশ তথা বাংলাদেশের দাম্ভিক জনতার বাইক-টাইক কিন্তু পছন্দ নয়। এখানে প্যাডেল বাইক বা মোটর বাইক যেন নিম্নবিত্তের বাহন। মধ্যবিত্তদের জন্য এটি অত্যন্ত সেনসেটিভ প্রেস্টিজ কনসার্ন, আর মেয়েদের জন্যতো ধর্মবিরুদ্ধ, সমাজবিরুদ্ধ ও রুচিবিরুদ্ধ এক গর্হিত কাজ। এর চেয়ে ঢের ভাল যেনÑ রাস্তায় রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে অথবা থেমে থাকা, স্টেশনে স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা বিরক্তি ও বিতৃষ্ণায় দিনমান পার করে দেয়া। রাস্তার জ্যামে মার্সিডিজ-বেঞ্জ বা পোরশে-লেক্সাস গাড়িতে বসে বসে কর্তৃপক্ষকে গালমন্দ ও দোষাদুষী করে কর্মশক্তি ও জীবনীশক্তি ক্ষয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়িষ্ণু জাতির খাতায় নাম লেখানোই যেন সার।
বাই সাইকেল বা মোটর সাইকেল চালানোয় বাঙালির অনীহার বিষয়টি নোয়াখালীর একটি প্রবচনের মত। ‘হমদে মায় রাঁধেনা, হুতেতো হান্তাভাত খায়না’। এর অর্থ হচ্ছে, এমনিতে মা কিছুই রান্না করেনি, অথচ ছেলে বলছে যে আমি পান্তা ভাত খাব না! যেখানে ৯৯% মানুষেরই নিজস্ব  ট্রান্সপোর্ট নেই, সেখানে রাস্তায় যানবাহনের অপেক্ষায় যৌবন ও জীবন ক্ষয় করা সত্ত্বেও আমরা বাই সাইকেল বা মোটর সাইকেলে চড়তে কুন্ঠিত ও লজ্জিত! সদাশয় সরকারের পক্ষ থেকেও এরূপ পরিবেশ-বান্ধব যানবাহন চালু ও জনপ্রিয় করার কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ট্যাক্স কমিয়ে এবং সাইকেল লেইন চালু করে সরকার এ বিষয়ে অতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন -সে কামনা এ বাঙাল কাঙ্গালের। 
আমাদের দেশে ঘর থেকে রাস্তায় বেরুলেই শুরু হয়ে যায় অবর্র্ণনীয় দুর্ভোগ। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যেতে চাইলে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পাবেন না আপনার কাঙ্খিত বাহন। অন্যদিকে ভাগ্যবান মানুষ হিসেবে নিজস্ব গাড়ি নিয়ে বের হলেই পড়বেন দুর্বিষহ ট্রাফিক জ্যামে। অর্থাৎ প্রাইভেট বা পাবলিক যে ট্রান্সপোর্টেই থাকুন না কেন, বিধির বিধান ‘দুর্বিষহ যানজট’ আপনাকে ছাড়বেই না। 
পাবলিক বাস ও মিনি বাসগুলো অধিকাংশই যেন মুড়ির টিন। যে দু’চারটা আধুনিক বাহন রয়েছে, তাও জনসংখ্যা বা প্রয়োজনের তুলনায় ২০% এর বেশি নয়। যানবাহনের অপেক্ষায় রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে এবং যানবাহন নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কেবল ঘন্টার পর ঘন্টাই নয়, বেলার পর বেলা পার করে দেয়া নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। রাস্তায় যানবাহনের দীর্ঘ লাইনে পড়ে থাকার দুর্ভোগ থেকে উদ্ধারের কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেই। আছে কেবল প্রতিশ্রুতি, ইশতেহার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রেস কনফারেন্স, পাবলিক এনাউন্সমেন্ট ইত্যাদি।
দুর্বিষহ যানজটে পড়ে মানুষের সময়, শ্রম ও অর্থের যে ক্ষতি হচ্ছে, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের যে অপচয় হচ্ছে, তার ঘন্টাপ্রতি হিসাব রীতিমত আতঙ্কের বিষয়। এভাবে প্রতিদিন, প্রতিবছর ব্যক্তির ক্ষতি, পরিবারের ক্ষতি এবং জাতীয় ক্ষতির পরিমাপের ফলাফলে হৃদস্পন্দন বন্ধ হবার উপক্রম হলেও সে পরিমাপেই বোঝা যাবেÑ জাতি হিসেবে কেন আমরা অন্যদের তুলনায় এত পিছিয়ে? একজন নাগরিক কিংবা একটি জাতির জীবনের প্রতিদিনের কয়েক কর্মঘন্টা যানজটে থমকে থামিয়ে রেখে উন্নত জাতির সাথে তাল মিলিয়ে এগুবার কথাবার্তা পাগলের প্রলাপ নয় কি?
বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সমস্যা যে যানজট, তার অন্যতম কারণ মহানগরীর এক প্রান্তের শিশু-কিশোরদের নিয়ে অভিভাবকদের অন্য প্রান্তের স্কুল ও কোচিং সেন্টারে দৈনিক কয়েকবার যাওয়া-আসা। এলাকাভিত্তিক স্কুলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়া-আসা বন্ধ হলে এবং মৌলিক শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে প্রাইভেট কোচিংয়ে চলাচল বন্ধ হলে যানজট সমস্যার সমাধান সহজ হবে। 
তাই দুর্বিষহ যানজট, অর্থ-শ্রম ও সময়ের অপচয়, মৌলিক শিক্ষায় ত্রুটি, ড্রপ-আউট, শ্রেণী-বৈষম্যসহ জাতীয় বহু সমস্যা থেকে দেশ রক্ষার তাগিদে আমি এলাকাভিত্তিক স্কুলিং মডেল প্রণয়ন করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মান্যবর মন্ত্রীবর্গকে পাঠিয়েছি। লন্ডনী বন্ধুবর মিজানুর রহমান মিজানের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় লিফলেট তৈরি করে জানান দিয়েছি ষ্টেক-হোল্ডারদেরকে। যে মডেলের বাস্তবায়ন এ মুহূর্তেই জরুরী, তা কেন এখনও বিববেচনায় আসছে না -এটি বোধগম্য নয়।
এ মডেলে বহু সমস্যার একক সমাধান নিহিত থাকায়ই সম্ভবত তা বাস্তবায়নের মুখ দেখছে না। কারণ, সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে স্বার্থান্বেষী কোন কোন মহলের স্বার্থ ক্ষুণœœ হয়। সেজন্যই হয়ত  সমস্যার মৌলিক সমাধান না করে তা নিয়ে যত জল্পনা-কল্পনা বা আলাপ-আলোচনার ‘মূলা ঝুলিয়ে’ রাখা যায়, ততই স্বার্থ-সিদ্ধির পথ সুগম হয়। তাই সমস্যার সহজ ও মূল সমাধানে আমাদের যত আপত্তি ও বিপত্তি। অনুরূপ কারণেই বিগত কোন শিক্ষানীতি আলোর মুখ দেখেনি এবং বর্তমান কল্যাণকর শিক্ষানীতি বাস্তবায়নেও একটি বিশেষ মহলের বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে।
ষ্টেক-হোল্ডারদের কাছে আমার প্রণীত  এলাকাভিত্তিক স্কুলিংয়ের মডেল এবং  ইউনিয়নভিত্তিক উপশহর তৈরির মডেল  (http://helal.net.bd/model/index.html) পাঠিয়ে এর শূন্য ফলাফলে আমি বুঝেছি যেÑ আমরা হয় সমস্যার মূলে যেতে পারিনা অথবা সমস্যার সহজ সমাধান চাই না। তাই যেকোন জাতীয় সমস্যা সমাধানের ‘নেপথ্য সমস্যা’ উদঘাটন এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক যুদ্ধ শুরুর সময় এখনই। 
যানজট দূরীকরণে আমাদের সরকার বদ্ধপরিকর এবং ইতোমধ্যে নানা অকার্যকর পদক্ষেপও নিয়েছে। তাতে যানজট কমেনি, বরং বেড়েছে। ঘড়ির কাঁটা ১ ঘন্টা এগিয়ে দেয়া, স্কুল ও অফিস টাইম পরিবর্তন করার ফলে যানজটতো কমেইনি বরং এসব নিস্ফল উদ্যোগের কারণে শিশু ও কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের অভিভাবক-শিক্ষকদের অসুবিধা কি পরিমাণ যে বেড়েছে Ñতা পত্রিকা ও টিভিতে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। অথচ এলাকাভিত্তিক স্কুলিং মডেলে আমি দেখিয়েছিÑ উত্তরা বা মিরপুরের শিক্ষার্থী মতিঝিল বা গুলশানে না এসে নিজ আবাসিক এলাকার  স্কুলে পড়লে রাস্তায় যাতায়াতের দরকার হবে না, ফলে ট্রাফিক জ্যাম হ্রাস পাবে। এতে দেশের জ্বালানী সাশ্রয়, অভিভাবকদের টেনশন, আর্থিক ব্যয় ও হয়রানি কমবে; সময়ের অপচয় হবে না, শিক্ষার মান বাড়বে, দেশপ্রেম বাড়বে, মৌলিক শিক্ষা উন্নত হবে।  এলাকাভিত্তিক স্কুলিং প্রবর্তিত হলেÑ প্রাথমিক শিক্ষার মজবুত ভিতের ওপর তৈরি হবে উচ্চশিক্ষার কাঠামো, যে কাঠামোতে প্রবেশাধিকার থাকবে শুধু মেধাবীদের। শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত এই মেধাবী শ্রেণীই দেশের শিক্ষা-গবেষণা-সরকার ও রাজনীতি পরিচালনার জন্য তৈরি হবে। বাকিরা উচ্চশিক্ষার পেছনে সময় ও অর্থ-অপচয় না করে কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের মধ্য দিয়ে দক্ষ ও সুযোগ্য নাগরিকে পরিণত হবে। এলাকাভিত্তিক স্কুলিংয়ের মাধ্যমে এরূপ পরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা মেধাবী  ছাত্র ও দক্ষ নাগরিকরাই পরিণত হবে প্রতিভাময় ও আলোকিত জাতিতে। এভাবে গড়ে ওঠা একটি মেধাবী প্রজন্মই সহজে বদলে দেবে সমাজ, দেশ কিংবা সমগ্র বিশ্বকে।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! শোনার বা পড়ার সময়ই বা কই? কথা বলা, বক্তৃতা করা, সেমিনার  করা আর অভিজাত হোটেলের খাবার-দাবার সাবাড় করাই সার।
ভিয়েতনামের ১৮ মন্ত্রণালয়
বনাম বাংলাদেশের ৩৭ যন্ত্রণালয়ঃ
ভিয়েতনামের আয়তন আমাদের দেশের তুলনায় দ্বিগুণ হলেও সে দেশের সরকারি সকল কর্মকা- পরিচালিত হয় ১৮টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। মন্ত্রণালয়গুলো হচ্ছে- Ministry of Education & Training, M/O Finance, M/O Agriculture & Rural Development, M/O National Defence, M/O Foreign Affairs, M/O Information & Communications, M/O Health, M/O Home Affairs, M/O Construction, M/O Public Security, M/O Justice, M/O Transport, M/O Industry & Trade, M/O Planning & Investment, M/O Science & Technology, M/O Natural Resources & Environment, M/O Labour, War Invalids & Social Affairs, M/O Culture, Sports & Tourism. এ থেকে স্পষ্ট যেÑ দেশের কার্যক্রম সম্পাদনে প্রয়োজন ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রণালয়ের বিন্যাস কিরূপ পরিমিতভাবে করতে হয়, তা ভিয়েতনামীরা জানে।
আয়তনে ভিয়েতনামের চেয়ে অর্ধেক হলেও বাংলাদেশে রয়েছে ভিয়েতনামের চেয়ে দ্বিগুণ সংখ্যক মন্ত্রণালয় এবং অসংখ্য মন্ত্রী (অসংখ্য বলছি এ কারণে যে, বাংলাদেশের ৯৯% মানুষই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীর নাম বা সংখ্যা মনে রাখতে পারে না)। তাই ভিয়েতনাম সরকারের ১৮ মন্ত্রীর কথা শুনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তারা কি দরিদ্র? নাকি মন্ত্রী নিয়োগে কৃপণ? Ñনা, এর কোনটিই নয়। তাদের কৃপণতা মন্ত্রীর জন্য ব্যয়ে নয়, অযথা অপচয়ে। তারা জনগণের করের অর্থ দিয়ে অযথা মন্ত্রীর বহর বাড়াতে চায় না। 
উন্নয়নশীল ভিয়েতনাম ছাড়াও অন্য অনেক উন্নত দেশে মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বাংলাদেশের মত এত বিশাল নয়। বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ হল্যান্ড’র সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হয় মাত্র ১৩টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে; তাদের মন্ত্রী সংখ্যা মাত্র ১৮। এশিয়ান টাইগার মালয়েশিয়ার মন্ত্রণালয় সংখ্যা ১৭ এবং আরেক টাইগার সাউথ কোরিয়ার মন্ত্রণালয় সংখ্যা ১৪। এ ধরনের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের তুলনায় বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর সংখ্যা কত হওয়া উচিত এবং সরকারের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের করের বোঝা কমানো, অন্যথায় সরকারের মন্ত্রণালয়ের ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়ানো কতটা জরুরী, তা নিয়ে শুধু ভাবলেই চলবে না, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার সময় এখনই।
আমাদের ছোট্ট দেশের মন্ত্রী পরিষদের তুলনায় বড় বড় বহু দেশের মন্ত্রী পরিষদ ২/৩ গুণ ছোট হয়েও তারা কিভাবে অর্থনৈতিক উন্নতির দিক থেকে আমাদের চেয়ে বহগুণ ঊর্ধ্বে এমনকি অনেকে শীর্ষেও অবস্থান করছে, সে বিষয়ে আমাদের ভাগ্য নিয়ন্তাদের অধ্যয়নের বা অনুকরণের যথার্থ সময়ও এখনই। মোদ্দাকথা হল, মন্ত্রী-সচিব-বক্তৃতা-বিবৃতি, ফিতাকাটা, পুষ্পস্তবক অর্পণ-তর্পণ -এসব আনুষ্ঠানিকতা ও কথাবার্তা  কমিয়ে অধিক কাজ না করলে কি এমনি এমনিতেই বা হাওয়ার বলে তারা বড় হয়েছে? তারা কথা-বার্তা, অহমিকা ও তর্জন-গর্জন কমিয়ে কাজ ও মেধা দিয়েই আমাদেরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে।
আমাদের মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা যেমনি বেশি, তেমনি এসব মন্ত্রণালয়ের রয়েছে স্বচ্ছতার অভাব। অথচ সাধারণের ন্যায় মন্ত্রীদেরও থাকা উচিত স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। বরং তাদের স্বচ্ছ হওয়া উচিত সাধারণ পাবলিকের চেয়েও অধিক। এজন্যই শিক্ষিত, উন্নত ও সভ্য জাতি বা দেশে সাধারণ মানুষের চেয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেশি। উন্নত দেশের মানুষ ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং ফ্রি মিক্সিং সোসাইটির স্বাদ ও সুবিধা ভোগ করে; কিন্তু মন্ত্রী বা সরকারি কর্তার খাতায় নাম লেখালেই সেসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। প্রতিপলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তাদের উন্নত ও সভ্য ধ্যান-ধারণার পরিচায়ক।
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে   বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল মনিকা লিউনেস্কির যে কেলেঙ্কারীতে, তারচে’ জঘন্য ঘটনার জন্যও সেখানে সাধারণ পাবলিককে কোন জবাবদিহি করতে হয় না। এরূপ ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে উদার সে সমাজে কোন অভিযোগ অনুযোগ বা জবাবদিহিতায় সাধারণ মানুষকে পড়তে হয় না ঠিকই; কিন্তু  রাষ্ট্রের ও প্রজাতন্ত্রের নেতা ও কর্মকর্তারা পাপ-পঙ্কিলতা বা যেকোন অন্যায়ের উর্ধ্বে থাকবেন; তারা থাকবেন neat, clean & polished। সাধারণ নাগরিকের চেয়ে অধিকতর কঠোরভাবে তারা আইন ও নিয়ম-কানুন মানবেন -এটাই নিয়ম, এটাই বিধি। সেসব দেশে দুর্নীতির অপরাধে মন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীরও সাজা হয়। ভিয়েতনাম সফরকালে জেনেছি যেÑ দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে  ক্ষমতাসীন দলের সাবেক পরিবহন মন্ত্রী Nguyi Van Tiem এখনো কারাগারে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে দুর্নীতির দায়ে মন্ত্রীকে জেলে ঢোকানোর সাম্প্রতিক সংবাদও কিন্তু প্রথম নয়। দুর্নীতির অভিযোগে পাকিস্তানের একটি আদালত সম্প্রতি সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রেহমান মালিকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেছে। সেসব দেশে দায়িত্বে অবহেলা বা অপকর্মের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী নিজেই পদত্যাগ করেন।
দায়িত্বে অবহেলা স্বীকারের সংস্কৃতি কিংবা দায়িত্বহীনতায় পদত্যাগের সংস্কৃতি অথবা কোন ভুলের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সংস্কৃতি বাংলাদেশের মন্ত্রী বা নেতা-নেত্রীদের মধ্যেই এখনো গড়ে ওঠেনি, আমলাদের মধ্যেও নয়; সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এরূপ সততা ও স্বচ্ছতার আচরণতো সুদূরপরাহত। 
মিথ্যে আত্মপ্রসাদে মত্ত কেউ কেউ হয়ত বলবেন, আমাদের মন্ত্রীরাওতো জেলে যায়..! ওহে আত্মঅহংকারী ভ্রাতা, তারা জেলে যায় যতটা না দুর্নীতির দায়ে, তারচে’ বেশি যায় প্রতিপক্ষের বা বিরোধী দলের প্রতিহিংসার ঘায়ে। আমাদের মন্ত্রীগণ জেলে যান কদাচিৎ; তাও কিন্তু নিজ দলের ক্ষমতায় থাকাকালীন নয়, ক্ষমতাহীন হবার পর; স্বদলের কারুর অভিযোগে নয়, বিরোধী দলের রোষানলে। আর তাই সে প্রতিহিংসার ক্ষমতা চলে গেলেই আবার তারা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যান; জেল গেটেই বরণীয় ও পূজনীয় হন পুষ্পমাল্যে এবং সেখান থেকেই সাড়ম্বর বক্তৃতা ও সেøাগানের শপথে আদা-জল খেয়ে পুনরায় শুরু করেন জাতির কল্যাণ উদ্দেশ্যে কাঁচা বা আধা-পাকা কাজ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এ জেল-জুলুম ও কারামুক্তির নাটক এবং বিরোধিতার সংস্কৃতিতে দরিদ্র এ জাতির অর্থ, সময় ও সুযোগের যে ব্যয় হয়, তা অন্যান্য ক্ষেত্রের অপচয়ের চেয়ে কম নয়। বিগত তত্তা¡বধায়ক সরকারের শুরুতে সে সরকারকে অনেকেই বাহবা দিয়েছিল যে, সেই কথিত ‘উদ্দিন’ সরকার বুঝি সব দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের জেলে পুরে দেশের মহাকল্যাণ ও জাতির ঐতিহাসিক উন্নয়ন করে ফেলছে! কিন্তু বছর না গড়াতেই এরূপ আশাবাদীদের মাথায় হাত; কোর্ট-কাচারি ও এটর্নীদের শশব্যস্ততা- ‘উদ্দিন’ সরকারের আটক করা সব মন্ত্রী, রাজনীতিক ও বাঘা বাঘা ব্যবসায়ীদের মুক্তি দেয়ায়। কিন্তু কেনইবা এদের জেলে ঢোকানোর মহোৎসব, আবার কেনইবা তাদের মুক্তির মিছিলের আনন্দ-উল্লাস; বাংলার জনগণ এসব  রা-জ-নী-তি ও কূটনীতির কিছুই জানতে পারেনি যেমনি, তেমনি এ খেলারাম খেলে যা -এর ক্রীড়নক সেই উদ্দিনদেরও করতে হয়নি কোন জবাবদিহিতা।
আশার কথা যে, আমাদের দেশেও সাম্প্রতিককালে মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আশ্বাস পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী মহোদয় বলেছেনÑ মন্ত্রী, এমপি ও সরকারি কর্মকর্তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে। দিন বদলের এ সরকারের উক্ত আশ্বাসে জনগণকে বিশ্বাস করাতে পারলে তা হবে সত্য ও ন্যায়ের চর্চায় এ সরকারের বৈপ্লবিক পদক্ষেপ, যা পরবর্তী যেকোন সরকারের জন্য অবশ্যই পালনীয়।
যত বেশি মন্ত্রণালয় তত বেশি যন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বাড়ালে  কাজের চেয়ে যে কথা বেশি হয়, তা বোধ করি অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা না করে সাধারণ জ্ঞান ও কল্যাণ-চিন্তায় উপলব্ধি করা যায়। প্রত্যেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর জন্য গাড়ি, বাড়ি, অফিস, পিএস, এপিএস, পিআরও, পিএ, পিও, ড্রাইভার, পিয়ন, আয়া-বুয়া-বাবুর্চি, চৌকিদার, দফাদার, সুইপার, মালী ছাড়াও মন্ত্রীগণের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের গাড়ি, বাড়ি, অফিস, পিএ, পিওন, ড্রাইভার সব সব খরচ মেটানোর হিসাব অনেক দীর্ঘ। এখানেই শেষ নয়, এসব মন্ত্রীর যাতায়াতে বিশেষ ব্যবস্থা তথা প্রোটোকল ও প্রটেকশনে রাষ্ট্রের ব্যয়, ব্যবস্থাপনা, আয়োজন, আনুষ্ঠানিকতা; রাস্তার চলাচলে তাদের অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অন্য সব্বাইকে থমকে থামিয়ে দেয়া...। তাঁরা আসল কাজ কতটা করেন, সে হিসাব চাওয়া বেয়াদবী বা অপরাধ হতে পারে। তাই সে কাজের হিসাব না বুঝলেও এতটুকু বুঝতে পারি, রাষ্ট্রীয় বাজেটের এই শ্বেতহস্তীরূপী ব্যয়ের বোঝা প্রকারান্তরে কুলি-মুটে-মজুরকেও বহন করতে হয়। দক্ষতার চেয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন বেশি করলে তা খেলার মাঠের ‘ফাউল’ -এর চেয়ে বড় অপরাধ বৈকি। উন্নত দেশের মন্ত্রীরা সে ফাউল বেশি করে না বলেই তাদের জনগণ শান্ত, জাতি সৌম্য। দক্ষতা ও নৈপুণ্য দেখাতে সৎ, শিক্ষিত, কল্যাণকামী, দেশপ্রেমী ও দায়িত্বশীল হতে হয়। এদেশে ক্ষমতা দেখাতে সেসব যোগ্যতার প্রয়োজন নেই, গলাবাজিই যথেষ্ট।

উন্নত দেশের মন্ত্রীসংখ্যা যদি আমাদের চারভাগের একভাগ বা অর্ধেকও হয়, তাহলে সেসব দেশের বা সে জাতির মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের জন্য সরকারের ব্যয় ও জন-যন্ত্রণা কত যে কম -তন্দ্রাচ্ছন্ন হে পাঠক সমাজ, আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠুন,  আত্মসচেতন হোন, হিসাব কষুন -হিসাব নিকাশ ছাড়া কোন দেশতো ধনী হয়নি, এমনকি হিসাব ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। -চলবে।

[পরবর্তী পর্বে থাকছে- হ্যানয় টয়লেট বনাম ঢাকা টয়লেট; ইভ টিজিং ও বখাটেদের আড্ডা ঃ ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ; ভিয়েতনামী ড্রেস ও বাঙালীর ওড়না সমাচার; ট্যুরিজম ও সদাচার সংস্কৃতি; লেক ম্যানেজমেন্টঃ ঢাকায় ও হ্যানয়ে ; ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে অটোমেশন ও ডিজিটাল পদ্ধতি; ওয়ার্ল্ড হেরিটেজঃ হ্যা-লং-বে]

লেখকঃ
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক
ফোনঃ ৯৫৫০০৫৫, ৯৫৬০২২৫
ই-মেইলঃ m7helal@yahoo.com

 
lbheading